মঠবাড়িয়া ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঠবাড়িয়া শিরোনাম ::
মঠবাড়িয়ায় হত্যা মামলায় দুজনের যাবজ্জীবন মঠবাড়িয়ায় গাজী ওয়াহিদুজ্জামান জাকিরের উদ্যোগে বৃক্ষ রোপণ ও বিতরণ কোভিড-১৯ প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করলেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর মঠবাড়িয়ায় পবিত্র কুরআন নিয়ে অশালীন মন্তব্যের অভিযোগ লাইসেন্স জটিলতা কাটিয়ে পুনরায় চালু হলো মঠবাড়িয়া টপটেন জেনারেল হাসপাতাল মঠবাড়ীয়া চুরির অভিযোগে তিনজনকে স্থানীয় জনতা আটক করেছে রাজশাহী বিভাগে ন্যস্ত হলেন মঠবাড়িয়ার ইউএনও আকলিমা আক্তার মেধার দ্যুতি ছড়াল চিকিৎসক-পুত্র উৎস, অলিম্পিয়াডের পর এবার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ মঠবাড়িয়ায় এতিমখানার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মঠবাড়িয়ায় অগ্রণী ব্যাংকের উদ্যোগে আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি-২০২৬ পালিত

অভিজ্ঞতার অহংকারে অভিজ্ঞ পতনঃ কেন হেরে গেলেন চারবারের সাংসদ ডা. ফরাজি

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
  • প্রকাশের সময় : ১১:০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ২৭৪ বার পড়া হয়েছে

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৬ পিরোজপুর-৩ মঠবাড়িয়া।
রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অনেক সময় আশীর্বাদ, আবার কখনো তা আত্মতুষ্টির ফাঁদে পরিণত হয়। ১৯৮৫–৮৮ সালে ডাঃ ফরাজির রাজনৈতিক স্বর্নালী যৌবন ছিল তুঙ্গে। মঠবাড়িয়ার প্রিয় জনবান্ধব কন্ঠস্বর সততার প্রতীক। চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, একবারের উপজেলা চেয়ারম্যান এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজি-এর সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয় সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।দীর্ঘ রাজনৈতিক পথযাত্রায় তাঁর উন্নয়ন অবদান মোটেই কম নয়।তার পরেও পরাজয়।এই পরাজয় হঠাৎ করে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দূরত্বের গল্প। যেখানে রুহুল আমীন দুলাল এর প্রাপ্ত ভোট– ৬৩১৩২ এবং ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজির প্রাপ্ত ভোট–৩৫৬২৩। ভোটের ব্যবধান ২৭৫০৯। ডঃ শামীম হামিদীর প্রাপ্ত ভোট ৩৫৩১২। জামাত জোট ও ইসলামী আন্দোলন কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি।দীর্ঘ অসন্তোস এর ফলে হাতপাখার ভোট কক্ষচ্যুৎ হয়ে ভিন্ন কক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নিম্নে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
১. আমিত্ববোধ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গঃ
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ফলে ডা. ফরাজির মধ্যে একধরনের ‘সব জানি’ মনোভাব তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, স্থানীয় নেতাদের অবমূল্যায়ন এবং কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণ তার জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরায়। প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করায় আস্থার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. স্বজনদের দুর্নীতি ও ড্রামা-কাণ্ডঃ
তার ঘনিষ্ঠ স্বজন—আত্মীয়স্বজন ও সহকারীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়।
৩. সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখতে ব্যর্থতাঃ
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মনে করেছিল, বিএনপির ধানের শীষে ভোট দিলে মৌলবাদী শক্তির উত্থান রোধ করা যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে তারা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি।
৪. আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট না পাওয়াঃ
আওয়ামী লীগপন্থি ভোটারদের ধারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ দ্বিতীয় শক্তি বিএনপিকে ভোট দিলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে যাবে না। ইসলামী দলের রেষারেসি বা জোটে ভোট দিলে জামায়াত-শিবিরের তৎপরতা বাড়তে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কৌশলগতভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ফরাজিকে ভোট দেয়নি।
৫. পর্যাপ্ত গণসংযোগের অভাবঃ
নির্বাচনী সময়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় মাঠে না থাকা, ঘরে ঘরে না যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ঘাটতি তার প্রচারণাকে দুর্বল করে তোলে।
৬. নিজস্ব শক্তিশালী কর্মীবাহিনীর দুর্বলতাঃ
একটি নির্বাচনে জয় পেতে যে সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী ও মাঠপর্যায়ের শক্ত অবস্থান প্রয়োজন, তা ডা. ফরাজির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না।
৭. বিপদে কর্মীদের পাশে না দাঁড়ানোঃ
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি অধিকাংশ সময় রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করতেন। স্থানীয় কর্মীরা বিপদে-আপদে তাকে পাশে না পেয়ে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৮. সাংবাদিকদের অবমূল্যায়নঃ
স্থানীয় ও জাতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব, তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করা এবং কিছু ক্ষেত্রে মামলার পথ বেছে নেওয়া গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
৯. জনসম্পৃক্ততার ঘাটতিঃ
একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে জনগণের যে নিত্যদিনের যোগাযোগ ও উপস্থিতি প্রয়োজন, তা তিনি নিয়মিতভাবে বজায় রাখতে পারেননি। মঠবাড়িয়ায় উপস্থিতি ছিল সীমিত, ঢাকায় অবস্থান ছিল দীর্ঘ।
১০. বাদুরা গ্রামের পাঁচ বাঁধ অপসারণে ব্যর্থতাঃ
মিরুখালীর বাদুরা গ্রামে অবৈধ পাঁচটি বাঁধ জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছালেও, জনগণকে আশ্বাস দিয়েও তা অপসারণে কার্যকর ভূমিকা না রাখায় ক্ষোভ আরও গভীর হয়।
উপসংহার
ডা. রুস্তম আলী ফরাজির পরাজয় কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের দূরত্ব, অবহেলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং জনআস্থার ক্ষয়ের সমষ্টিগত প্রতিফলন। রাজনীতিতে ক্ষমতা নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি—এই নির্বাচনী ফলাফল সেই চিরন্তন সত্যকেই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের জন্য শিক্ষা প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয়না।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

অভিজ্ঞতার অহংকারে অভিজ্ঞ পতনঃ কেন হেরে গেলেন চারবারের সাংসদ ডা. ফরাজি

প্রকাশের সময় : ১১:০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৬ পিরোজপুর-৩ মঠবাড়িয়া।
রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অনেক সময় আশীর্বাদ, আবার কখনো তা আত্মতুষ্টির ফাঁদে পরিণত হয়। ১৯৮৫–৮৮ সালে ডাঃ ফরাজির রাজনৈতিক স্বর্নালী যৌবন ছিল তুঙ্গে। মঠবাড়িয়ার প্রিয় জনবান্ধব কন্ঠস্বর সততার প্রতীক। চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, একবারের উপজেলা চেয়ারম্যান এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজি-এর সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয় সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।দীর্ঘ রাজনৈতিক পথযাত্রায় তাঁর উন্নয়ন অবদান মোটেই কম নয়।তার পরেও পরাজয়।এই পরাজয় হঠাৎ করে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দূরত্বের গল্প। যেখানে রুহুল আমীন দুলাল এর প্রাপ্ত ভোট– ৬৩১৩২ এবং ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজির প্রাপ্ত ভোট–৩৫৬২৩। ভোটের ব্যবধান ২৭৫০৯। ডঃ শামীম হামিদীর প্রাপ্ত ভোট ৩৫৩১২। জামাত জোট ও ইসলামী আন্দোলন কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি।দীর্ঘ অসন্তোস এর ফলে হাতপাখার ভোট কক্ষচ্যুৎ হয়ে ভিন্ন কক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নিম্নে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
১. আমিত্ববোধ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গঃ
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ফলে ডা. ফরাজির মধ্যে একধরনের ‘সব জানি’ মনোভাব তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, স্থানীয় নেতাদের অবমূল্যায়ন এবং কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণ তার জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরায়। প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করায় আস্থার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. স্বজনদের দুর্নীতি ও ড্রামা-কাণ্ডঃ
তার ঘনিষ্ঠ স্বজন—আত্মীয়স্বজন ও সহকারীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়।
৩. সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখতে ব্যর্থতাঃ
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মনে করেছিল, বিএনপির ধানের শীষে ভোট দিলে মৌলবাদী শক্তির উত্থান রোধ করা যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে তারা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি।
৪. আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট না পাওয়াঃ
আওয়ামী লীগপন্থি ভোটারদের ধারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ দ্বিতীয় শক্তি বিএনপিকে ভোট দিলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে যাবে না। ইসলামী দলের রেষারেসি বা জোটে ভোট দিলে জামায়াত-শিবিরের তৎপরতা বাড়তে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কৌশলগতভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ফরাজিকে ভোট দেয়নি।
৫. পর্যাপ্ত গণসংযোগের অভাবঃ
নির্বাচনী সময়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় মাঠে না থাকা, ঘরে ঘরে না যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ঘাটতি তার প্রচারণাকে দুর্বল করে তোলে।
৬. নিজস্ব শক্তিশালী কর্মীবাহিনীর দুর্বলতাঃ
একটি নির্বাচনে জয় পেতে যে সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী ও মাঠপর্যায়ের শক্ত অবস্থান প্রয়োজন, তা ডা. ফরাজির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না।
৭. বিপদে কর্মীদের পাশে না দাঁড়ানোঃ
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি অধিকাংশ সময় রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করতেন। স্থানীয় কর্মীরা বিপদে-আপদে তাকে পাশে না পেয়ে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৮. সাংবাদিকদের অবমূল্যায়নঃ
স্থানীয় ও জাতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব, তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করা এবং কিছু ক্ষেত্রে মামলার পথ বেছে নেওয়া গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
৯. জনসম্পৃক্ততার ঘাটতিঃ
একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে জনগণের যে নিত্যদিনের যোগাযোগ ও উপস্থিতি প্রয়োজন, তা তিনি নিয়মিতভাবে বজায় রাখতে পারেননি। মঠবাড়িয়ায় উপস্থিতি ছিল সীমিত, ঢাকায় অবস্থান ছিল দীর্ঘ।
১০. বাদুরা গ্রামের পাঁচ বাঁধ অপসারণে ব্যর্থতাঃ
মিরুখালীর বাদুরা গ্রামে অবৈধ পাঁচটি বাঁধ জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছালেও, জনগণকে আশ্বাস দিয়েও তা অপসারণে কার্যকর ভূমিকা না রাখায় ক্ষোভ আরও গভীর হয়।
উপসংহার
ডা. রুস্তম আলী ফরাজির পরাজয় কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের দূরত্ব, অবহেলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং জনআস্থার ক্ষয়ের সমষ্টিগত প্রতিফলন। রাজনীতিতে ক্ষমতা নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি—এই নির্বাচনী ফলাফল সেই চিরন্তন সত্যকেই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের জন্য শিক্ষা প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয়না।